কোনো ফলাফল পাওয়া যায়নি

    হিগস বোসন কী?

    আমাদের চারপাশের সবকিছু— আপনি, আমি, এই কম্পিউটার, দূর আকাশের তারা— সবই গঠিত অতি ক্ষুদ্র এক ধরণের কণা দিয়ে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই কণাগুলোই বা কী দিয়ে তৈরি? এদের ভর আসে কোথা থেকে? এই রহস্যের উত্তর লুকিয়ে আছে এক বিস্ময়কর কণার মধ্যে, যার নাম হিগস বোসন। সাধারণ্যে এটি ‘ঈশ্বর কণা’ বা ‘গড পার্টিকেল’ নামেও পরিচিত। কিন্তু কেন এটি এত গুরুত্বপূর্ণ? কী এর কাজ? কীভাবেই বা এর অস্তিত্ব প্রমাণিত হলো? আসুন, কণাপদার্থবিজ্ঞানের এই জটিল জগতে ডুব দিয়ে সবিস্তারে জেনে নিই সেই কাহিনি।

    হিগস বোসন কী?

    হিগস বোসনের ধারণা— এক স্বপ্নের সূচনা

    হিগস বোসনের গল্প শুরু হয় ১৯৬৪ সালে। স্কটল্যান্ডের এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী পিটার হিগস একটি নতুন ধরণের কণার ধারণা দেন। একই সময়ে আরও কয়েকজন বিজ্ঞানী (ফ্রাঁসোয়া এংলার্ট, রবার্ট ব্রাউট, টম কিবল প্রমুখ) স্বাধীনভাবে একই ধারণা প্রস্তাব করেন। কিন্তু কী সেই যুগান্তকারী ধারণা?

    তাঁদের বক্তব্য ছিল, মহাবিশ্ব জুড়ে বিরাজ করছে একটি অদৃশ্য শক্তিক্ষেত্র, যার নাম দেওয়া হলো ‘হিগস ফিল্ড’ বা ‘হিগস ক্ষেত্র’। এই ক্ষেত্রের মধ্য দিয়ে যখনই কোনো কণা চলাচল করে, তখনই এই ক্ষেত্রের সাথে মিথষ্ক্রিয়ার ফলে কণাটি ‘ভর’ অর্জন করে। অনেকটা যেন জলের মধ্য দিয়ে হাঁটার সময় আমরা যেমন বাধা অনুভব করি, তেমনই হিগস ক্ষেত্রের বাধায় কণাগুলো ধীর হয়ে যায় এবং ভর লাভ করে। আর এই ক্ষেত্রের আন্দোলন বা উত্তেজনা থেকেই জন্ম নেয় ‘হিগস বোসন’ নামক কণাটি।

    বিষয়টা একটু খোলসা করে বলা যাক। আমরা জানি, মহাবিশ্বের সবকিছুই মৌলিক কণা দিয়ে তৈরি। এই কণাগুলোকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়: ফার্মিয়ন (যেমন ইলেকট্রন, কোয়ার্ক—যারা বস্তু গঠন করে) এবং বোসন (যেমন ফোটন, গ্লুঅন—যারা বল বহন করে)। এখন এই কণাগুলো ভর পায় কী করে? হিগসের তত্ত্ব বলছে, একটি বিশেষ ক্ষেত্র—হিগস ক্ষেত্র—সার্বত্রিকভাবে ছড়িয়ে আছে। কিছু কণা এই ক্ষেত্রের সাথে জোরে মিথষ্ক্রিয়া করে, ফলে তারা বেশি ভর পায়; আবার কিছু কণা (যেমন ফোটন) একেবারেই মিথষ্ক্রিয়া করে না, তাই তারা ভরশূন্য থাকে। আলোর গতি এত বেশি হওয়ার কারণই হলো ফোটনের কোনো ভর নেই!

    স্ট্যান্ডার্ড মডেল ও হিগস বোসনের ভূমিকা

    হিগস বোসনের গুরুত্ব বুঝতে হলে কণাপদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে সফল তত্ত্ব ‘স্ট্যান্ডার্ড মডেল’-এর কথা বলতে হবে। এটি একটি কাঠামো, যা মহাবিশ্বের মৌলিক কণা ও তাদের মধ্যকার বলগুলোকে ব্যাখ্যা করে। এই মডেলে ১২টি ফার্মিয়ন (৬টি কোয়ার্ক ও ৬টি লেপটন), ৪টি বলবাহী বোসন (ফোটন, গ্লুঅন, ডব্লিউ ও জেড বোসন) এবং সর্বশেষ সংযোজন—হিগস বোসন।

    কিন্তু স্ট্যান্ডার্ড মডেলের একটা বড় সমস্যা ছিল: গণিতের সমীকরণগুলো তখনই কাজ করত, যখন বলবাহী কণাগুলো (বিশেষ করে ডব্লিউ ও জেড বোসন) ভরহীন বলে ধরা হতো। অথচ বাস্তবে এরা বেশ ভারী। এই অসামঞ্জস্য দূর করতেই প্রয়োজন ছিল একটি নতুন প্রক্রিয়ার—যা ‘হিগস মেকানিজম’ নামে পরিচিত। হিগসের তত্ত্ব বলল, হিগস ক্ষেত্রের মাধ্যমেই ডব্লিউ ও জেড বোসনরা ভর পায়। এটি ছিল যুগান্তকারী এক সমাধান।

    তাই বলা যায়, হিগস বোসন স্ট্যান্ডার্ড মডেলের ‘শেষ পাজল টুকরা’। এটি ছাড়া পুরো মডেলটিই অসম্পূর্ণ থেকে যেত।

    কেন ‘ঈশ্বর কণা’? নামকরণের কাহিনি

    হিগস বোসনকে ‘ঈশ্বর কণা’ (God Particle) নামটি দিয়েছিলেন নোবেলজয়ী পদার্থবিদ লিওন লেডারম্যান। ১৯৯৩ সালে তিনি এই শিরোনামে একটি বই লেখেন। কিন্তু কেন এমন নাম?

    লেডারম্যান নিজেই বলেছিলেন, তিনি প্রথমে নাম দিতে চেয়েছিলেন ‘গডড্যাম পার্টিকেল’ (Goddamn Particle), কারণ এই কণাটি খুঁজে পাওয়া এতটাই দুরূহ যে তা বিজ্ঞানীদের কাছে অভিশাপের মতো মনে হচ্ছিল। কিন্তু প্রকাশক আপত্তি করায় সংক্ষেপে রাখা হয় ‘গড পার্টিকেল’। তবে নামটি অনেক বিতর্কের জন্ম দেয়। পিটার হিগস নিজেও এই নাম অপছন্দ করতেন। ধর্মীয় আবহ থাকায় তিনি মনে করতেন, এতে বিভ্রান্তি ছড়ায়। বাস্তবে হিগস বোসনের সাথে কোনো ধর্মীয় ‘ঈশ্বরের’ সম্পর্ক নেই। এটি নিছকই বিজ্ঞানের একটি আবিষ্কার।

    আরও পড়ুন - আলো কি তরঙ্গ নাকি কণা?

    আবিষ্কারের রোমাঞ্চকর পথচলা

    প্রায় ৫০ বছর ধরে বিজ্ঞানীরা হিগস বোসনের খোঁজ করে চলেছিলেন। কিন্তু এটি এতই ক্ষণস্থায়ী (জীবনকাল মাত্র ১.৫৬×১০⁻²² সেকেন্ড) যে সরাসরি দেখা অসম্ভব ছিল। শেষ পর্যন্ত সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অবস্থিত সার্ন (CERN) গবেষণাগারে নির্মিত হলো পৃথিবীর বৃহত্তম কণা ত্বরকযন্ত্র— লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডার (এলএইচসি)।

    এলএইচসি-তে ২৭ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি বৃত্তাকার সুড়ঙ্গের মধ্যে দুটি বিপরীতমুখী প্রোটন রশ্মিকে প্রায় আলোর বেগে সংঘর্ষ করানো হয়। এই সংঘর্ষে সৃষ্টি হয় মহাজাগতিক তাপমাত্রা, আর মুহূর্তের জন্য জন্ম নেয় বিভিন্ন মৌলিক কণা—যার মধ্যে থাকতে পারে হিগস বোসনও। কিন্তু প্রায় ১ বিলিয়ন সংঘর্ষে মাত্র ১ বার হিগস বোসন পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এটি যেন খড়ের গাদায় সুচ খোঁজার মতো এক দুরূহ কাজ।

    অবশেষে ৪ জুলাই, ২০১২। সার্নের বিজ্ঞানীরা ঘোষণা করলেন, তারা ১২৫ গিগাইলেকট্রনভোল্ট (GeV) ভরবিশিষ্ট একটি নতুন কণা আবিষ্কার করেছেন, যা হিগস বোসনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। পরে আরও নিশ্চিত হওয়া গেল, এটিই সেই বহুপ্রতীক্ষিত কণা। প্রোটনের চেয়েও প্রায় ১৩০ গুণ ভারী এই কণার আবিষ্কারে ATLAS এবং CMS নামের দুটি আলাদা ডিটেক্টর গ্রুপ কাজ করেছিল। সম্ভাব্যতা এতটাই নিশ্চিত ছিল যে, ভুল হওয়ার আশঙ্কা ছিল মাত্র এক মিলিয়নের মধ্যে এক ভাগ!

    পিটার হিগস— নিভৃতচারী এক জিনিয়াস

    হিগস বোসনের আবিষ্কার যেমন রোমাঞ্চকর, তেমনি এর প্রবক্তা পিটার হিগসের জীবনও কম চমকপ্রদ নয়। ১৯২৯ সালে ইংল্যান্ডের নিউক্যাসেলে জন্মগ্রহণকারী এই বিজ্ঞানী ছোটবেলা থেকেই গণিত ও পদার্থবিদ্যায় অসম্ভব মেধাবী ছিলেন। এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন দীর্ঘদিন। কিন্তু চমকপ্রদ ব্যাপার হলো, হিগস ছিলেন অত্যন্ত প্রচারবিমুখ। এমনকি ২০১৩ সালে যখন নোবেল পুরস্কারের জন্য তাঁর নাম ঘোষণা করা হয়, তখন তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান, যাতে মিডিয়া তাঁর সাক্ষাৎকার নিতে না পারে।

    পিটার হিগস তাঁর তত্ত্বের নামকরণ নিয়েও অস্বস্তিবোধ করতেন। ‘হিগস বোসন’ নামটি তিনি পছন্দ করতেন না, কারণ তাঁর মনে হতো এতে অন্য বিজ্ঞানীদের অবদান অস্বীকার করা হয়। তিনি সবসময় বলতেন, এটি একটি দলগত প্রচেষ্টা। ২০২৪ সালের ৮ এপ্রিল, ৯৪ বছর বয়সে এই মহান বিজ্ঞানী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

    সত্যেন বোস ও হিগস বোসন— অবদান ও বিতর্ক

    বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে প্রায়ই একটি প্রশ্ন ওঠে: হিগস বোসনের সাথে সত্যেন্দ্রনাথ বসুর কী সম্পর্ক? এবং কেন তাঁকে স্বীকৃতি দেওয়া হলো না?

    প্রথমেই বলে রাখি, সত্যেন বোস ছিলেন এক অসামান্য প্রতিভা। পদার্থবিজ্ঞানে ‘বোসন’ নামটি তাঁরই নাম থেকে এসেছে। তিনি ও আইনস্টাইন মিলে ‘বোস-আইনস্টাইন পরিসংখ্যান’ নামে যে তত্ত্ব দেন, তা দিয়ে এক ধরণের কণার আচরণ ব্যাখ্যা করা যায়—যেগুলোকে বলা হয় বোসন। কিন্তু এর সাথে হিগস বোসনের কোনো সরাসরি সম্পর্ক নেই। বোসন একটি কণার শ্রেণি (শ্রেণিবিন্যাস), আর হিগস বোসন হচ্ছে সেই শ্রেণিরই একটি বিশেষ কণা, যার অস্তিত্বের ধারণা দেন পিটার হিগস। বিষয়টি অনেকটা এরকম: আপনি যদি একটি নতুন প্রজাতির বিড়াল আবিষ্কার করেন, তাহলে তার নাম দেবেন ‘নতুন বিড়াল’। এখন ‘বিড়াল’ শব্দটা যিনি প্রথম ব্যবহার করেছেন, তিনি সব বিড়ালের আবিষ্কারক নন, তিনিও পাবেন না কৃতিত্ব। ঠিক তেমনই, হিগস বোসনের কৃতিত্ব পিটার হিগস ও তাঁর সহযোগীদের, কিন্তু ‘বোসন’ নামটি সত্যেন বোসের অবদানকেই স্মরণ করিয়ে দেয়। তাই বিভ্রান্তির কোনো কারণ নেই।

    হিগস বোসনের ভবিষ্যৎ— এখনও অনেক রহস্য বাকি

    ২০১২ সালে আবিষ্কারের পর থেকেই হিগস বোসন কণা পদার্থবিজ্ঞানের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে। জার্মানির ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউটের সাম্প্রতিক গবেষণা থেকে জানা গেছে, কীভাবে হিগস বোসন ডব্লিউ ও জেড বোসনের সাথে মিথষ্ক্রিয়া করে এবং ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে বটম কোয়ার্কে পরিণত হয়। এই ফলাফল স্ট্যান্ডার্ড মডেলের ভবিষ্যদ্বাণীকে আরও শক্তভাবে সমর্থন করে। বিজ্ঞানীরা এখন হিগস বোসনের আরও বিস্তারিত ধর্ম জানতে চান।

    সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, হিগস বোসনই কি সব রহস্যের শেষ? নাকি এটি আরও কোনো নতুন পদার্থবিজ্ঞানের দ্বার খুলে দেবে? অনেক বিজ্ঞানী মনে করেন, ডার্ক ম্যাটার (অদৃশ্য বস্তু) এবং ডার্ক এনার্জির রহস্যভেদেও হিগস বোসন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এলএইচসি-তে এখনো গবেষণা চলছে, এবং ভবিষ্যতে আরও বড় কোনো ত্বরকযন্ত্র নির্মাণের পরিকল্পনাও আছে।

    হিগস বোসন কেবল একটি কণা নয়; এটি হলো মহাবিশ্বের অস্তিত্ব রক্ষার এক অনন্য চাবিকাঠি। এই কণা বা এর জন্য দায়ী হিগস ক্ষেত্র না থাকলে কোনো পরমাণুই তৈরি হতো না। ইলেকট্রন, প্রোটন, নিউট্রন— কোনো কিছুরই অস্তিত্ব থাকত না। ফলে গ্যালাক্সি, নক্ষত্র, গ্রহ বা প্রাণ— কিছুই হতো না। হিগস বোসনের আবিষ্কার তাই শুধু একটি বৈজ্ঞানিক সাফল্য নয়, এটি আমাদের অস্তিত্বেরই একটি গভীর ব্যাখ্যা।

    পরিশেষে বলা যায়, পিটার হিগস ও তাঁর সহযোগীদের দূরদৃষ্টি এবং সার্নের হাজারো বিজ্ঞানীর অক্লান্ত পরিশ্রম আমাদের পৌঁছে দিয়েছে জ্ঞানের এক নতুন দিগন্তে। 

    আরও পড়ুন - চাঁদের উৎপত্তির গল্প

    একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

    নবীনতর পূর্বতন

    نموذج الاتصال